আজ শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
গর্ভাবস্থায় খিঁচুনি: মা ও শিশুকে সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি: চিকিৎসার মানের বাইরে যে প্রশ্নগুলো জরুরি সাতক্ষীরায় বিসিবি’র বয়সভিত্তিক ক্রিকেট প্রাক-বাছাই ২৫ অক্টোবর মহাষ্টমীতে পূজামন্ডপ পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ পিটিয়ে মারার উদ্দেশ্য ছিল না, দুর্ঘটনাবশত হয়েছে সাতক্ষীরায় ১৯০ সহকারী শিক্ষকের পদায়ন শারদীয় দুর্গাপূজায় সম্প্রীতি ও সহযোগিতার আহ্বান সৈয়দ ইফতেখার আলীর ভিডিএফের খুলনা বিভাগীয় সভাপতি বাগেরহাটের শুভ্র, সম্পাদক সাতক্ষীরার হোসেন আলী তরুণদের অংশগ্রহণে খুলনায় তিন দিনব্যাপী ‘স্বাধীনতা প্রকল্প’ প্রশিক্ষণ চাঁপাইনবাবগঞ্জে গরুবোঝাই ভটভটি উল্টে বাবা-ছেলেসহ নিহত ৩, আহত ৮

সাতক্ষীরায় অর্ধেকে নেমেছে খেজুরের রস-গুড় উৎপাদন, হারাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য

শীতের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়া ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সাতক্ষীরায় খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।
একসময় শীত এলেই গ্রামাঞ্চলে উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হতো খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির মৌসুম। তবে বর্তমানে সেই চিরচেনা দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় প্রায় ২৩০ হেক্টর জমিতে এক লাখ ৮ হাজারের বেশি খেজুর গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে নিয়মিত রস সংগ্রহ করা গেলে বছরে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে তা নেমে এসেছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে কমে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে শীতের সময়কাল কমে গেছে। এতে গাছিরা সময়মতো গাছ কাটতে পারছেন না, আবার অনেক কৃষকও আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন দিন দিন কমছে।
তিনি আরও জানান, সব গাছ থেকে নিয়মিত রস সংগ্রহ করা গেলে জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও গুড় সরবরাহ করা সম্ভব হতো। এতে কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটত। তবে বর্তমানে যে পরিমাণ উৎপাদন হচ্ছে, তা জেলার চাহিদা মিটিয়ে সীমিত পরিসরে অন্য জেলায় যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা তালা উপজেলার নগরঘাটা এলাকার গাছি মো হাফিজুল ইসলাম বলেন, আগে শীত অনেক আগে আসতো, এখন অনেক দেরিতে আসে। এতে গাছ কাটতেও দেরি হয়। আবহাওয়ার কারণে রসও কম হচ্ছে। আগে ১৫ থেকে ১৬টা গাছে ১০থেকে ১২টা হাঁড়ি রস পাওয়া যেত, এখন সেখানে মাত্র ৩ থেকে ৪টা হাঁড়ি পাওয়া যায়।
তিনি জানান, আগে খেজুর গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকত না। বর্তমানে প্রায় সব জায়গাতেই পানি জমে থাকে, যা রস উৎপাদনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরঘাটার বাসিন্দা সাইদুজ্জামান বলেন, একসময় আমাদের এলাকায় প্রচুর খেজুর গাছ ছিল। এখন গাছের সংখ্যাই কমে গেছে। অনেক কৃষক আর গাছ কাটেন না, আবার অনেক জায়গায় গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। ফলে রসের সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শীতের মৌসুমে পিঠা পুলির উৎসব, খেজুরের রস সবই এখন আগের মতো নেই। আমরা চাই খেজুর গাছ সংরক্ষণ করে এই ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনা হোক।
তালা উপজেলার ইসলামকাটি গ্রামের বাসিন্দা মিলন বিশ্বাস বলেন, ছোটবেলায় দেখতাম বাবা চাচারা খেজুর ও তাল গাছ কাটতেন। গাছের নিচে গিয়ে পাটকাঠির নল দিয়ে রস খেতাম। এখন আর সেই দৃশ্য দেখা যায় না।
একই গ্রামের গাছি মিজানুর রহমান জানান, খেজুরের রস পুরোপুরি শীতের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, আগে একটি গাছে এক ভার রস হতো, এখন তার অর্ধেকেরও কম। রস কম হলে গুড়ও কম হয়। বর্তমানে অনেকেই খেজুর গাছ জ্বালানির কাজে ব্যবহার করছে, যা খেজুর শিল্পের জন্য বড় হুমকি। আগের মতো গাছিও নেই। নতুন করে এই পেশায় কেউ আসতে চাই না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ সংরক্ষণ, গাছিদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সরকারি উদ্যোগ বাড়ানো গেলে সাতক্ষীরায় আবারও খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে এবং হারিয়ে যেতে বসা এই গ্রামীণ ঐতিহ্য নতুন করে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ট্যাগস:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক তথ্য সম্পর্কে

সর্বোচ্চ পঠিত

গর্ভাবস্থায় খিঁচুনি: মা ও শিশুকে সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ

সাতক্ষীরায় অর্ধেকে নেমেছে খেজুরের রস-গুড় উৎপাদন, হারাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য

আপডেট সময়: ০৯:৪০:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
শীতের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়া ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সাতক্ষীরায় খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।
একসময় শীত এলেই গ্রামাঞ্চলে উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হতো খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির মৌসুম। তবে বর্তমানে সেই চিরচেনা দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় প্রায় ২৩০ হেক্টর জমিতে এক লাখ ৮ হাজারের বেশি খেজুর গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে নিয়মিত রস সংগ্রহ করা গেলে বছরে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে তা নেমে এসেছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে কমে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে শীতের সময়কাল কমে গেছে। এতে গাছিরা সময়মতো গাছ কাটতে পারছেন না, আবার অনেক কৃষকও আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন দিন দিন কমছে।
তিনি আরও জানান, সব গাছ থেকে নিয়মিত রস সংগ্রহ করা গেলে জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও গুড় সরবরাহ করা সম্ভব হতো। এতে কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটত। তবে বর্তমানে যে পরিমাণ উৎপাদন হচ্ছে, তা জেলার চাহিদা মিটিয়ে সীমিত পরিসরে অন্য জেলায় যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা তালা উপজেলার নগরঘাটা এলাকার গাছি মো হাফিজুল ইসলাম বলেন, আগে শীত অনেক আগে আসতো, এখন অনেক দেরিতে আসে। এতে গাছ কাটতেও দেরি হয়। আবহাওয়ার কারণে রসও কম হচ্ছে। আগে ১৫ থেকে ১৬টা গাছে ১০থেকে ১২টা হাঁড়ি রস পাওয়া যেত, এখন সেখানে মাত্র ৩ থেকে ৪টা হাঁড়ি পাওয়া যায়।
তিনি জানান, আগে খেজুর গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকত না। বর্তমানে প্রায় সব জায়গাতেই পানি জমে থাকে, যা রস উৎপাদনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরঘাটার বাসিন্দা সাইদুজ্জামান বলেন, একসময় আমাদের এলাকায় প্রচুর খেজুর গাছ ছিল। এখন গাছের সংখ্যাই কমে গেছে। অনেক কৃষক আর গাছ কাটেন না, আবার অনেক জায়গায় গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। ফলে রসের সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শীতের মৌসুমে পিঠা পুলির উৎসব, খেজুরের রস সবই এখন আগের মতো নেই। আমরা চাই খেজুর গাছ সংরক্ষণ করে এই ঐতিহ্য আবার ফিরিয়ে আনা হোক।
তালা উপজেলার ইসলামকাটি গ্রামের বাসিন্দা মিলন বিশ্বাস বলেন, ছোটবেলায় দেখতাম বাবা চাচারা খেজুর ও তাল গাছ কাটতেন। গাছের নিচে গিয়ে পাটকাঠির নল দিয়ে রস খেতাম। এখন আর সেই দৃশ্য দেখা যায় না।
একই গ্রামের গাছি মিজানুর রহমান জানান, খেজুরের রস পুরোপুরি শীতের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, আগে একটি গাছে এক ভার রস হতো, এখন তার অর্ধেকেরও কম। রস কম হলে গুড়ও কম হয়। বর্তমানে অনেকেই খেজুর গাছ জ্বালানির কাজে ব্যবহার করছে, যা খেজুর শিল্পের জন্য বড় হুমকি। আগের মতো গাছিও নেই। নতুন করে এই পেশায় কেউ আসতে চাই না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ সংরক্ষণ, গাছিদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সরকারি উদ্যোগ বাড়ানো গেলে সাতক্ষীরায় আবারও খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে এবং হারিয়ে যেতে বসা এই গ্রামীণ ঐতিহ্য নতুন করে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।