ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীর ঘাটে নৌকা বেঁধে বসে থাকেন জেলেরা। আকাশে মেঘ, চারপাশে নোনা জলের গন্ধ সব প্রস্তুত, শুধু নেই অনুমতি। কারণ আজ থেকে তিন মাসের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে সুন্দরবনের দুয়ার।
কাগজে-কলমে এই সময়টাতে বন থাকে মানুষের প্রবেশমুক্ত জেলে, মৌয়াল, বাওয়াল বা ভ্রমণকারীদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বন বিভাগের ভাষায়, এটি প্রকৃতির জন্য ‘বিশ্রামের সময়’। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বাস্তবে কি সত্যিই তিন মাস বিশ্রাম পায় সুন্দরবন?
সুন্দরবন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও এই সময় পুরোপুরি থেমে থাকে না সুন্দরবনের ভেতরের কার্যক্রম। জীবিকার তাগিদে অনেক জেলে ও মৌয়াল ঝুঁকি নিয়ে গোপনে বনে প্রবেশ করেন। একই সময়ে সক্রিয় থাকে অসাধু চক্র, যারা বিষ দিয়ে মাছ ধরা, শুঁটকি তৈরি কিংবা অবৈধ শিকারের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা রেঞ্জে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৩১ হেক্টর। এই বিশাল বনাঞ্চল তদারকির জন্য রয়েছে ৪টি স্টেশন ও ১২টি ক্যাম্প। গত অর্থবছরে প্রায় ৪৬ হাজার জেলে, বাওয়ালি ও অন্যান্য বনজীবী অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশ করেছিলেন। ফলে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়ছেন।
গাবুরা ইউনিয়নের জেলে রবিউল ইসলাম বলেন, তিন মাস আয় বন্ধ থাকলে আমাদের বাঁচা কঠিন হয়ে যায়। কোনো সহায়তা না থাকলে অনেকেই বাধ্য হয়ে বনে ঢুকে পড়ে। তবুও তিন মাস বন্ধ থাকলে বড় সমস্যা হতো না, যদি সুন্দরবনের ভিতরে জলদস্যুদের টাকা না দিতে হতো। যে ৯ মাস বন খোলা থাকে, প্রতি মাসেই তাদের টাকা দিতে হয়। কত আয় করি আর কত চলে যায় তার হিসাবই থাকে না। ঋণের বোঝা নিয়েই বছর পার করতে হয়। এই তিন মাসে আমাদের জন্য কোনো সরকারি সহায়তাও নেই।
স্থানীয়দের মতে, বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ ও চিংড়ির প্রাচুর্য থাকে। কিন্তু এই সময়ই নিষেধাজ্ঞা থাকায় জীবিকার চাপে অনেকে গোপনে প্রবেশ করেন। এতে করে একদিকে আইন ভাঙা হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বনজ সম্পদের ক্ষতি।
একজন অভিজ্ঞ জেলে জানান, এই সময় মাছ বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু যেতে না পারলে সংসার চলে না। তাই অনেকেই ঝুঁকি নেয়।
এছাড়া এই সময়ে বনের ভেতরে গাছ কেটে মাছ শুকানোর স্থান তৈরি, যাকে স্থানীয়ভাবে খোটি বা রঙঘর বলা হয়, সেখানে আগুন জ্বালিয়ে শুঁটকি তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা হাফিজুল বলেন, বনের ভেতরে অনেক কিছুই হয়, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না। সুযোগ নিয়ে অনেকে অবৈধ কাজ করে।
এ বিষয়ে সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের ফরেস্টার এরফান উদ্দীন বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারও তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় সুন্দরবন সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ইতোমধ্যে মাইকিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং এই সময়ে সব ধরনের অনুমতিপত্র প্রদান বন্ধ থাকবে।
তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বন বিভাগ, উপকূলরক্ষী বাহিনী ও নৌপুলিশ যৌথভাবে নজরদারি চালাবে। কেউ নির্দেশনা অমান্য করে বনে প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পর্যটন কার্যক্রমও সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
টহল কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি জানান, এই সময়ে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম যেমন স্মার্ট টহল অব্যাহত থাকবে। ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করা হবে এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে বিশেষ টহল দল গঠন করা হয়েছে। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিতের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা বনের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় চলাচল করব না। নদীপথে টহল জোরদার করা হবে, যাতে বন্যপ্রাণীর প্রজনন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না হয়।
গোপনে প্রবেশের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেকে বিভিন্ন দিক দিয়ে গোপনে প্রবেশের চেষ্টা করে। আমরা তা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাব। এ ধরনের কাজে বন বিভাগের কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ইয়ুথনেট গ্লোবাল সাতক্ষীরা জেলা সমন্বয়ক আশিকুর রহমান বলেন, তিন মাস সুন্দরবন বিশ্রামে যায় এটা বলা হলেও বাস্তবে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। এই সময়েও হরিণ শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও শুঁটকি তৈরির মতো ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৪৬ হাজার বনজীবী এই নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন হয়ে পড়েন। কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নেয়।
তিনি দাবি করেন, জলদস্যুদের যে পরিমাণ টাকা দিতে হয়, সেই টাকা যদি জেলেদের কাছেই থাকত, তাহলে তিন মাস কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু বাস্তবে তারা একদিকে চাঁদা দেয়, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞায় আয় বন্ধ থাকে।
একদিকে বন সংরক্ষণ, অন্যদিকে মানুষের জীবন-জীবিকার বাস্তবতা এই দুইয়ের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে তিন মাসের এই সিদ্ধান্ত। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই এই তিন মাসে সত্যিই কি বিশ্রাম পায় সুন্দরবন, নাকি জীবিকার চাপে আড়ালেই চলতে থাকে বনের অদৃশ্য ক্ষয়?
ইব্রাহিম খলিল 














